মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

ভাষা ও সংষ্কৃতি

ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি কোন অঞ্চলকে ঘিরে যদি সমৃদ্ধি লাভ করে না, তবুও বলতে বাধা নেই যে, এই বৃহত্তর লাকসামের রয়েছে বিরাট একটা ভাষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক বলয়। এখানে ভাষার উৎকর্ষ সাধনে এবং এই ভাষার একটা বিরাট স্থান জুড়ে রয়েছে তার বিচরণক্ষেত্র যে, কতটা, তা আজকের সময়ে  উপলব্ধি করতে হবে। বাংলা ভাষার উৎকর্ষ সাধণে এবং বাংলার জনগণের মনের গভীরে যে, ভাষার গভীরতা রয়েছে তা আমাদের প্রনিধান করতে হবে।ভাষার একটা শক্তি ও বলীয়ান দিক রয়েছে যা মানুষকে সাহসী করে এবং সাংস্কৃতির একটা বিরাট অংশ জুড়ে উহার চালিকা শক্তি। লাকসামের গর্ভের ধন নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী সর্বপ্রথম ’’রুপজালাল ’’ কাব্য লেখেন। বঙ্কিমচন্দ্র ও মীর মোশাররফের আমলে যা কখনও কল্পনা করা যায়নি, তা ফয়জুন্নেছার লেখায় সম্ভব হয়েছে। গীত লিখেছেন তিনি। প্রচুর গীত কবিতার সমন্বয়ে লিখেছেন ’’সংগীত লহরী’’। সাংস্কৃতিরই একটি বিশেষ অংশ সংগীত। তিনি লিখেছেন ’’বারমাসী’’ যা ছিল এমনরুপ ঃ-

বিয়ের গান-

 

প্রথমে প্রভূকে স্মরি

হাত মুখ ধৌত করি

পরে করি মস্তক ধর্ষণ

নালো সজনী

ঠাঁই ঠাঁই যত নারী

একে অন্য জনে ধরি

গায় গীত সবাই কৌতুহলে

নালো সজনী।

প্রায় ১৮৭৬ সালের এই লেখা কালজয়ী ভাষা ও সংস্কৃতির অঙ্গন হয়ে আছে।বাংলা ভাষার উৎকর্ষ সাধনে অনন্ত কৃষ্ণ ধর লাকসামের কোন এক অঞ্চল হতে যে পত্রিকা প্রকাশ করছেন তা জেলা গেজেটিয়ারে পাওয়া যায়। পত্রিকার নাম ছিল ’’নূতন আলো ’’ ইহা ফয়জুন্নেছার ও অনেক পূর্বেকার পত্রিকা ছিল। জেলা গেজেটিয়ারে ২১৬ পৃষ্টায় যা ছাপা হয়েছিল উহার কোন কপি আজও সংগ্রহ করা যায়নি। লাকসামের ভাষার ইতিহাস  অনেক সমৃদ্ধ তা  খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বের করতে হবে এবং আঞ্চলিক ভাষার উৎকর্ষ সাধনে তৎপর হতে হবে।

ভাষা-সাহিত্য ও সংস্কৃতির উপর গবেষণালব্ধ জ্ঞান আমাদের সীমিত হলেও আমরা দেখতে পাই গাজীকালু চম্পাবতী, সোনাইবিবির গান, কবি গান, পালা গান, সীতা বিলাপ, আরোও কত কি গজল গান, গীত এ অঞ্চলের লোক মুখে গীত হত। গ্রামে গ্রামে জারীসারী গানের আসর বসত। ঢোল, কর্তাল, সারিন্দা, দোতারা, একতারা, খঞ্জনী  এসব কত রকমের গানের সাথে বাজনার আগমন ঘটল। পুঁথির সাহায্যে পুঁথির পাঠের আসর বসত জমজমাট হয়ে। পাল্টা পুঁথির আসর বসত গ্রামে এবং এ জনপদের হাট-বাজারে লাকসাম কেন্দ্রিক গ্রাম্য সংস্কৃতির সঙ্গে পুঁথি পাঠ ও কবি গানের প্রচলন ছিল। বিয়ে-শাদীতে কবি গানের আসর বসত এবং উৎসব আয়োজনের অঙ্গনে ছড়ার কাটাকাটি হত অনেক উপভোগ্য। বিয়ে বাড়ীর বা কোন পূজো পার্বনে ভাব আদান প্রদানে পানের খিলির কদর ছিল। কে কত প্রকার পানের খিলি বানাতে পারে বা হুক্কাতে তামাক সাজাতে পারে তা দেখার বিষয় ছিল। আত্মীয় এলে প্রথমেই পান, পিড়ি অতঃপর তামাক জল পিড়িতে বসতে দেয়া একটা ঐতিহ্য ছিল।জমিদার বাড়ীতে নাটক, জারী-সারী, গানের আসর বসত, জমিদারেরা শিল্পীদেরকে উৎসাহ যোগাত এবং যাত্রা গানেরও কদর ছিল।

একুশের চেতনায় বাংলা ভাষার উৎকর্ষ বেড়ে যায়। পাকিস্তানীরা বাংলা ভাষাকে কতই না রূপ বদলাতে চেষ্টা করেছে। সে জন্য লাকসাম কেন্দ্রীয় অনুবাদসংঘ গঠন করা সময়ের দাবী ছিল। পাকিস্তানীরা চেয়েছিল, রোমান অক্ষরে বাংলাকে বদলাতে বাঙালীরা তা হতে দেয়নি। রক্তের  বিনিময়ে বাংলাকে আমরা জিইয়ে রেখেছি। এদেশের প্রত্যেক মানুষ বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার আন্দোলনে সোচ্চার ছিল। মিটিং, মিছিল, একুশের চেতনা ও প্রেরণা লাকসামবাসীকেও এগিয়ে নেয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ৫২ এর ২১শের বলা যায় ৮ই ফাল্গুনের প্রেরণা আমাদের ভাষার আন্দোলনের গোড়ার দিক যে সিঁড়ি ৫২ এ লাগিয়ে ছিলাম উহার উপর ভর করেইত ৭১ এর স্বাধীনতা এসেছে। আমাদের বাংলা ভাষার অতীত অতি গৌরব এবং আমাদের সংস্কৃতিও অতি গৌরবের। ইহার ধারাবাহিকতা আমাদের জানতে হবে এবং মূল বিষয়ে আলোকপাত করতে হবে। লেখা, কবি, সাহিত্যিক, গবেষক, সৃষ্টি করেছে আমাদের বাংলা ভাষা  ও সাহিত্যের অঙ্গনে একটা বড় ধরনের স্থান করে নিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের মত কালজয়ী মানুষ তৈরী করতে পেরেছে। আমরা যারা সাহিত্যের সেবা করছি, তাদের জন্য সত্যিকার বন্ধুর প্রয়োজন রয়েছে। যাঁরা লেখকের মূল্যায়ন করবে এমন বন্ধু চাই। ঐতিহ্যবাহী বৃতত্তর লাকসামের নিজস্ব একটা সংস্কৃতিক ও ভাষার বিচরণ ক্ষেত্র ছিল। সমগ্র বৃহত্তর কুমিল্লা জেলাকে দীর্ঘ বছর ধরে লাকসামেরই নেতৃত্ব ও শাসন বলবৎ ছিল। লাকসামের হাসানুজ্জামান খাঁন, মৌলভী আবদুল হাকিম টিকিউএ, এম,সি,এ আবদুল আউয়াল, সৈয়দ ছেরাজুল হক চৌধুরী এঁরা প্রয়াত নেতা। শিল্প, সাহিত্য, ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে এঁরা জড়িত ছিলেন। পৃষ্ঠপোষক ও গবেষক এম,এ আজম লাকসামেরই লোক। তিনি কবি সম্মেলন করেছিলেন লাকসামে পরবর্তী পর্যায়ে লাকসামকে আলোকিত করেছিলেন বহু গুনীজন, এদের কাছে লাকসামবাসী ঋণী থাকবে।

লাকসামে একসময় পাবলিক লাইব্রেরী ছিল সেখানে বই-পুস্তক পড়া হতো এবং ভ্রাম্যমান পাঠাগার ছিল। মৌলভী জালাল আহম্মেদ এম,সি,এ লাইব্রেরী পরিচালনা করতেন। বর্তমানে পাবলিক লাইব্রেরীতে বই প্রচুর আছে তবে পাঠক শূন্য। পত্রিকা ও প্রেসক্লাব অনেক জৌলুশ নিয়ে গড়ে উঠছে ইহা সুলক্ষণ এবং তা জাতীয় উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। শিল্পকলা একাডেমী একসময় ছিল, এখন নেই। ১৮৭৬ সালের ১লা জানুয়ারী ১৩১ বর্গমাইল বিশিষ্ট ছাগলনাইয়া থানা নোয়াখালী জেলার সাথে সংযুক্ত হয়ে যায়। এতে লাকসামের সাথে ছাগলনাইয়া বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও উহার প্রভাব লৌকিক জীবনে পড়ে। ছাগলনাইয়ার ভাষার সঙ্গে লাকসামের কিছু মিল খুঁজে পাওয়া যায়। কাজেই লাকাসামের সঙ্গে সাংস্কৃতিক ও ভাষার মিল অনেকটা নোয়াখালীর এবং লাকসামের কৃষ্টি ঐতিহ্য সুদূর প্রসারী হতে বাধ্য হয়।

কাকড়ী ও ডাকাতিয়া নদী একসময় এ জনপদের উপর দিয়ে প্রবাহিত হতো। বর্তমানে নদী দু’টি পলি মাটিতে ভরাট হয়ে প্রায় পানিশূন্য হতে চলছে। বর্ষায় আগের দিনে এই দুই নদীর তীরের গ্রাম প্লাবিত হত। রাস্তাঘাট প্রায় পানিতে সয়লাব হয়ে থাকত। তাই মানুষের মন মানষিকতার যথেষ্ট পরিবর্তন দেখা  যেত। বর্তমানে বন্যার তান্ডব তেমন নেই। শিল্প বিপ্লবেও লাকসামে সাংস্কৃতিক পরিবর্তন এসেছে। গড়ে উঠছে শিল্প প্রতিষ্ঠান।ভাষার রূপান্তর ঘটছে তবে কথ্য ভাষা ও লেখ্য ভাষার একটা ব্যবধান সর্বত্র দেখা যায়। মানুষ জনেরা কথা বলে এক প্রকার এবং লেখে অন্যরকম, এতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। যাক লাকসাম জনপদের আরেক জন গীতি কবি প্রয়াত এস,এম হেদায়েত। স্বাধীনতা আন্দোলনে তাঁর লেখার প্রভাব পড়েছিল অনেক।উত্তর লাকসামের হিন্দু ও বৌদ্ধদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় আচার আচরণ  ভাষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে  বিশেষ অবদান রাখছে।

পঞ্চাশের দশকে লাকসামে লেখক সংঘ গঠন করা হয়েছিল। উহার কার্যক্রম এখনও পরিচালিত হয়ে আসছে। প্রয়াত অধ্যাপক বীরেন্দ্র কিশোর মজুমদার উহার বিশিষ্ট সদস্য ছিলেন। কবি আলাওলের উপর তাঁর লেখা সমাজে সমাদৃত হয়েছিল। নোয়াখালী রামচন্দ্রপুর কলেজের প্রফেসার ইব্রাহিম রহমত উল্ল্যা ও একজন বিশিষ্ট সদস্য ছিলেন। বর্তমান শিল্প সাহিত্যের গবেষক অধ্যাপক এহেতেশাম হায়দার চৌধুরী বর্তমানে নিমসার কলেজে আছেন। যারা লাকসামের সাহিত্য সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অবদান রেখে যাচ্ছেন।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়াত উপচার্য প্রফেসর এম শামছুল হক, সংঘরাজ প্রয়াত জ্যোতিপাল মহাথেরো লাকসামের লোক। লাকসামের ভাষা ও সাহিত্য ও সংস্কৃতির অঙ্গনে তাঁদেরও  পদচারনা ও অবদানকে স্বীকার করলে আমরা নিজেরাও সমৃদ্ধ হতে পারব।

মোঃ আবদুল জলিল, ভাষা সৈনিক হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছেন জেলা পর্যায়ে। জাতীয় পর্যায়েও  বর্তমান নিয়মানুসারে তালিকভূক্তির কাজ চলছে। তিনি লিখেছেন ‘‘লাকসাম কথামালা’’ পীর মুর্শিদের আস্তানা, বৃহত্তর কুমিল্লার সাংবাদিকতার উদ্ভব ও বিকাশ, মহিয়সী ফয়জুন ইত্যাদি। দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে প্রকাশিত হচ্ছে সাপ্তাহিক লাকসাম পত্রিকা। এছাড়াও লাকসামে, লাকসাম বার্তা, আলোর দিশারী, জয়কন্ঠ, সাপ্তাহিক পত্রিকা সমূহ নিয়মিত প্রকাশনার মাধ্যমে লাকসামের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিক অঙ্গনে অবদান রেখে যাচ্ছে।স্মরণ করা যায়  প্রয়াত করুনকুমার দেবরায়কে যিনি ছাত্র জীবন থেকে সাংবাদিকতা, লেখালেখি, ডাকাতিয়া নামের ম্যাগাজিন বহুবার প্রকাশ করেছেন। আরো কিছু সাংস্কৃতিক কর্মী যাঁরা লাকসামের ভাষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করার প্রয়াসে দীর্ঘ বছর ধরে বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করছেন। এদের মাঝে সাংবাদিক ও খেলাঘর আসর সংগঠক সিরাজুল ইসলাম রাহীর কথা উল্লেখ্যযোগ্য । একইভাবে সুরকার ও গীতিকার এছহাক খোকন বর্তমানে বাংলাদেশ বেতারের সাথে জড়িত। লেখক সাহিত্যিক হিসাবে সুহৃদ জাহাঙ্গীর, সাংবাদিক ও প্রকাশনায় এস,এস দোহা কোন না কোন ভাবে এ ক্ষেত্রে অবদান রেখে যাচ্ছেন।

 

সৌজন্যেঃ ১। মোঃ আবদুল জলিল, ভাষা সৈনিক ও সম্পাদক, সাপ্তাহিক লাকসাম, কুমিল্লা।

              ২। মোঃ জাহাঙ্গীর আলম মজুমদার, সক্রিয় সদস্য, লাকসাম লেখক সংঘ, কুমিল্লা।